০৫ নভেম্বর ২০২৬ , ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

আধুনিক রাজশাহী গড়তে পরিকল্পিত নগরায়নের বিকল্প নেই: আরডিএ চেয়ারম্যান

বিশেষ প্রতিনিধি
আপলোড সময় : ০৫-১১-২০২৬
আধুনিক রাজশাহী গড়তে পরিকল্পিত নগরায়নের বিকল্প নেই: আরডিএ চেয়ারম্যান ছবিঃ সংগৃহীত

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহানগরী রাজশাহীকে আধুনিক, পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত আবাসন, নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, যানজট, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশদূষণসহ নগরীর নানা সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন আরডিএর চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নগর উন্নয়নের বর্তমান চিত্র, বিদ্যমান সমস্যা, উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাজশাহী নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক নগরী গড়ে তোলা মানে শুধু বড় ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণ নয়। বরং নিরাপদ আবাসন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাই প্রকৃত নগর উন্নয়নের লক্ষ্য।

আবুল কালাম আজাদ সুইট বলেন, রাজশাহীর উন্নয়ন হতে হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও জনবান্ধব। বর্তমানের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আগামী কয়েক দশকের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগর সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরডিএর মহাপরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

নগরীর অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে অপরিকল্পিত ও নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন আরডিএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, নির্মাণবিধি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ভূমি ব্যবহারের নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।

কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও আবাসিক ভবন নির্মাণের চেষ্টা করছে। এতে নগর পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, সড়ক চলাচল এবং সামগ্রিক নাগরিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, নগরীর শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষায় আইন ও বিধিবিধান বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। অনুমোদন ছাড়া কিংবা অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করা হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শুধু অভিযান বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। ভবন মালিক, আবাসন ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, স্থপতি ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

রাজশাহীর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট নিরসনকে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন আরডিএ চেয়ারম্যান। নগরীর জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কের ওপর চাপও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক নির্মাণ বা সম্প্রসারণের পরিবর্তে পুরো নগরীর যোগাযোগব্যবস্থাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, নতুন সড়ক নির্মাণ, বিদ্যমান সড়ক প্রশস্তকরণ, গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর উন্নয়ন, সংযোগ সড়ক তৈরি এবং যানবাহন চলাচলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল এবং পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থাও গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মহাপরিকল্পনার আলোকে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো সাজানো গেলে নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত সহজ হবে। বাণিজ্যিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নাগরিকদের ভোগান্তিও কমবে।

তিনি বলেন, আধুনিক নগরীর জন্য শুধু সড়ক নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর গণপরিবহন, নিরাপদ ফুটপাত, সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতে যানবাহনের চাপ বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো পরিকল্পনা।

রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরেই পরিচ্ছন্নতা ও সবুজ পরিবেশের জন্য পরিচিত। এই ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি আরও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আবুল কালাম আজাদ সুইট।

তিনি মনে করেন, নগর উন্নয়নের নামে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা যাবে না। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং খোলা জায়গা রক্ষার মাধ্যমে নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

বিশেষ করে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং পরিবেশসম্মত নগর অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, সিটি করপোরেশন ও নাগরিকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

পদ্মা নদীর তীর ঘিরে রাজশাহীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। পদ্মাপাড়ের সৌন্দর্যবর্ধন, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র এবং নাগরিকদের অবসর কাটানোর উপযোগী স্থান তৈরি করা গেলে নগরীর সৌন্দর্যের পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাও বাড়বে।

একটি আধুনিক নগরীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টন। নগরীর কোনো একটি এলাকায় সব ধরনের সুবিধা কেন্দ্রীভূত না রেখে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্যিক অঞ্চল, বিনোদনকেন্দ্র ও অন্যান্য নাগরিক স্থাপনা পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন আরডিএ চেয়ারম্যান।

তাঁর মতে, নগরীর প্রতিটি এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

আবাসন সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো, খেলার মাঠ, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান এবং বিনোদনকেন্দ্র সংরক্ষণ করতে হবে।

বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপদ চলাচল এবং নাগরিক সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টি নগর পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। একটি বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে হলে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রয়োজনকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

তিনি মনে করেন, মহাপরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন, ভূমির সঠিক ব্যবহার এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে রাজশাহীকে আরও আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব।

নগর উন্নয়নে শুধু সরকারি সংস্থার উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন আবুল কালাম আজাদ সুইট। তাঁর মতে, পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে নাগরিকদের সচেতনতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা, প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে।

তিনি বলেন, নগর উন্নয়ন একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন।

নাগরিকদের আইন মেনে চলা, যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলা, ফুটপাত ও সড়ক দখল না করা, ভবন নির্মাণে বিধিবিধান অনুসরণ এবং নগরীর পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, নগরবাসী নিজেদের শহরের উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় অংশীদার হলে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও টেকসই হবে।

ভবিষ্যৎ রাজশাহী নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আরডিএ চেয়ারম্যান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং নাগরিক সুবিধার সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও তার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজশাহীকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব মহানগরীতে পরিণত করা সম্ভব।

এ জন্য উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। রাজশাহীর ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলাই হওয়া উচিত নগর উন্নয়নের মূল লক্ষ্য। উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপে নাগরিকদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সম্মিলিত উদ্যোগ, সঠিক পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজশাহী একদিন দেশের অন্যতম আধুনিক, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ